“অগণতান্ত্রিক” আওয়ামী লীগের প্রকৃত ভোটব্যাংক কত? নির্বাচন ও সংখ্যাতাত্ত্বিক ভোটের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রায় ২৭ শতাংশ (দক্ষিণে ২৯ এবং উত্তরে ২৫ শতাংশ) ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে দাবি করা হচ্ছে। নানা অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত এই কমিশনের কথায় সাধারণ মানুষের বিশ্বাস তলানিতে হলেও তর্কের খাতিরে আমরা ২৭ শতাংশের অংকটা সত্যি ধরে নিচ্ছি। এই ২৭ শতাংশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (যা মোট ভোটের প্রায় ১৫ ভাগের কাছাকাছি) আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পেয়েছে বলে দাবী করছে। নির্বাচনে শত অনিয়মের সাক্ষ্য বিবেচনায় নিয়েও তর্কের খাতিরে আওয়ামী লীগের এই ভোটের পরিমাণ ১৫ ভাগ বা তারও কিছুটা বেশি বলে ধরে নেওয়া যাক [যে ৭৩ শতাংশ মানুষ ভোট বয়কট করেছে তারা স্বজ্ঞানেই বয়কট করেছে ধরে নিয়ে]। প্রশ্ন হচ্ছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে এই যে ঢাকঢোল পিটিয়ে নির্বাচন-নির্বাচন খেললো, তাতে মাত্র ১৫ ভাগ লোক তাদের পক্ষে সাড়া দিলো? তার মানে কি এই যে সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক বর্তমানে ১৫ শতাংশ? বাকী ৮৫ শতাংশ ভোটারই কি আওয়ামী লীগ বিরোধী? সত্যিই কি তাই? না হলে প্রকৃত চিত্র কী?

রাজনীতি বিশ্লেষক কিংবা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক – সবাই স্বীকার করবেন যে প্রকৃত চিত্র এর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এই ১৫ শতাংশের বাইরেও হয়তো আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক রয়েছে যারাও হয়তো এই নকল ভোট-ভোট খেলায় ভোট দিতে যাওয়ার কোনো মানে খুঁজে পাননি, যদিও সত্যিকারের একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা ঠিকই আসতেন এবং হয়তো নিজ দলকেই ভোট দিতেন। প্রশ্ন হচ্ছে আওয়ামী লীগের এই ঘোষিত ও অঘোষিত সমর্থকের সংখ্যা মিলিয়ে কত হবে? আওয়ামী বিরোধী বা বিএনপি‘র-ইবা কত? গত ২০ বছরে এই সংখ্যার হেরফের হয়েছে? হলে কেন হয়েছে? গণতন্ত্রহীনতার সাথে এই ভোটব্যাংক হেরফেরের কোন সম্পর্ক আছে? কতটুকু? চলুন এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যাক।

একটি প্রকৃত নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীরা তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের বাইরে স্বতন্ত্র ও সরকার-বিরোধী (এন্টি ইনকাম্বেন্সি) ভোট পাবেন, যার ফলে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের সাথে এগুলোও যুক্ত হবে। অপরপক্ষে শাসক দল ক্ষমতায় থাকার ফলে (এবং স্পষ্টত অপশাসনের কারণে) নিজস্ব ভোট ব্যাংকের বাইরে খুব সামান্য ভোটই পেতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি‘র নিজস্ব ভোটব্যাংক আসলেই কত?

১৯৯১ ও ১৯৯৬ দুটি নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের ঘরে ছিলো। বাকী ভোট প্রধানত জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামী ও কিছু ক্ষুদ্র দলের মধ্যে ভাগ হয়। যেমন ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট প্রদত্ত ভোটের ৩০.৮ শতাংশ ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগ পায় ৩০.১ শতাংশ ভোট। জামায়াত ১২.১ ও জাতীয় পার্টি প্রায় ১১.৯ শতাংশ করে ভোট পায় এবং বাকী প্রায় ১৫ শতাংশ ভোট বিভিন্ন ক্ষুদ্র দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ হয়। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটের শেয়ার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় (১৫ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসে) এবং দ্বিদলীয় রাজনীতি আরেকটু সংহত হয়, যার ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের ভোট বেড়ে যায় – আওয়ামী লীগ পায় ৩৭.৪ শতাংশ ভোট (পূর্বের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি) ও বিএনপি পায় ৩৩.৬ শতাংশ ভোট (পূর্বের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি)। এখানে উল্লেখ্য যে বিএনপি ১৯৯১-৯৬ সালের পাঁচ বছর সরকার পরিচালনার পরও তাদের ভোট প্রায় ৩ শতাংশ বাড়ে)। জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সম্মিলিত ভোট আবারও ২৪ শতাংশের ঘরে থাকে (যদিও জামায়াতের ভোট ১২.১ শতাংশ থেকে কমে ৮.৬ শতাংশে এবং জাতীয় পার্টির ভোট ১১.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.৪ শতাংশ হয় – সম্ভবত জোট রাজনীতির কারণে)।

১৯৯৬ পরবর্তী রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ভোটের রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে তাদের ভোট মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি‘র ঘরে জমা হতে থাকে। যা স্পষ্ট হয় ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সে নির্বাচনে বিএনপি ৪০.৪ শতাংশ ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগ ৪০ শতাংশ ভোট পায়। উল্লেখ্য এ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগ ১৯৯৬-২০০১ সালে সরকার পরিচালনা সত্ত্বেও তাদের ভোট ১৯৯৬ সালের চেয়ে প্রায় ২.৫ শতাংশ বাড়ে। জাতীয় পার্টির ভোট পূর্বের নির্বাচনে প্রাপ্ত ১৬.৪ শতাংশ থেকে কমে ৭.৪ শতাংশে এবং জামায়াতের ভোট ৮.৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৩ শতাংশে নেমে আসে। এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভোটের সংখ্যা পূর্বের ৪ শতাংশ থেকে কিছুটা বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্রমান্বয়ে তাদের ভোটব্যাংক সুসংহত করে এবং দেশে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা থিতু হতে থাকে। অর্থাৎ এই ভোটটাকে তারা নিজস্ব ভোটব্যাংক হিসেবেই বিবেচনা করতে পারে। একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দুই দলের সামনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদলে একটি টেকসই দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। তারা তাদের এই নিজস্ব ভোটব্যাংক আরও সুসংহত করার সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে পারতো।

ঝামেলাটা তৈরি করে বিএনপি, ২০০৬ সালে। তারা নির্বাচন নিয়ে একটা অনাস্থার পরিবেশ তৈরি করে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবে তা নিয়ে)। তারও পূর্বে বিএনপি’র ২০০১-০৬ সালের শাসন (বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা) গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বিরাট হোঁচট হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং বাংলাদেশের পরবর্তী গণতন্ত্রহীনতার সাথে এর সম্ভাব্য যোগসূত্র খোঁজা হবে। তাদের অপরিণামদর্শী বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে একটি দু:খজনক প্রেক্ষাপট তৈরি হয় এবং ২০০৭-০৮ সালে একটি আধা-সামরিক শাসন ঝেঁকে বসে। বিএনপির ২০০১-০৬-এর অপশাসন এবং ২০০৬ সালে নির্বাচন নিয়ে ওসব ভুলের ফলশ্রুতিতে কি তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক কমেছে? হ্যাঁ, বেশ কমেছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর প্রতিফলন দেখা যায়। বিএনপির ভোটের পরিমাণ ২০০১ সালের ৪০.৪ শতাংশ থেকে কমে ৩৩.২ শতাংশে নেমে আসে – অর্থাৎ তাদের প্রাপ্ত ভোট ৭ বছরের ব্যবধানে ৭.২ শতাংশ কমেছে। এর কারণ দলটির অপশাসনের ফলে বহু মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে এবং যার ফলে তারা, বিশেষ করে তরুণরা আরো বেশি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে সরকার-বিরোধী সুইং ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ভোট ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশে পৌঁছায়। জাতীয় পার্টির ভোট ৭.৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে আসে এবং জামায়াতের ভোট ৪.৩ শতাংশ থেকে কিছুটা বেড়ে ৪.৬ শতাংশে উন্নীত হয়।

Source: Daily Mirror Online

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ধরে নেওয়া যায় যে আওয়ামী লীগের ২০০১ সালের ভোট ব্যাংক অটুট ছিলো, যা প্রায় ৪০ শতাংশ। এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের এই ভোটব্যাংকের সাথে সরকার-বিরোধী (এন্টি ইনকাম্বেন্সি) ভোট যুক্ত হয়ে তারা প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু তারাও বিএনপির ২০০১-০৬ সালের অপশাসন থেকে শিক্ষা না নিয়ে একের পর এক হঠকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করতে থাকে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে সংঘটিত কিছু বড় ধরনের কেলেংকারি (শেয়ারবাজারে লুটপাট ও ব্যাংক ব্যবস্থায় জালিয়াতি) দেশের অসংখ্য মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যার ফলে তাদের ২০০৮-১৪ শাসনামলেও বহু মানুষের মোহভঙ্গ হওয়ার কথা। দলটি ২০০৮ সালে ৪৯ শতাংশের মতো ভোট পেলেও তাদের মূল ভোটব্যাংক ছিলো ৪০ শতাংশের কাছাকাছি এবং বাকী ৯ শতাংশ সরকার-বিরোধী স্বতন্ত্র ভোট এবং ওই ৯ শতাংশ মানুষ স্বভাবতই সুইং ভোটার হওয়ায় তারা পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিবে না যদি-না দলটি ‘চমৎকার‘ সুশাসন উপহার দেয়। আওয়ামী লীগের ২০০৮-১৪ শাসন মানুষের সুশাসনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ তো করেইনি বরং তারা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘৃতাহুতি দিয়েছে এবং সামগ্রিক অপশাসনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যার ফলে কেবল সুইং ৯ শতাংশই নয়, বরং সমসাময়িক নির্বাচনী প্রবণতা অনুসারে (২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মতো) আওয়ামী লীগের তাদের নিজস্ব ভোট ব্যাংক ৪০ শতাংশ থেকেও ভোট হারানোর কথা। ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রবণতা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের তথাকথিত অনেক অনুগত সমর্থকেরও মোহভঙ্গ হওয়ার কথা এবং ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব ভোটব্যাংক ৪০ শতাংশ থেকে কমে আমার বিবেচনায় ৩০ শতাংশের আশেপাশে চলে আসার কথা।

গণতন্ত্রের ট্রেনটি স্বাভাবিকভাবে চললে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি তার নিজস্ব প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটব্যাংকের সাথে ১০ শতাংশ সুইং ভোটার যুক্ত হয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ (কিংবা আরো বেশি) ভোট নিয়ে ক্ষমতায় ফিরার কথা ছিলো এবং আওয়ামী লীগ নিজেদের হ্রাসকৃত প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটব্যাংকের সমর্থন পেয়ে বিরোধী দলে বসতো। কিন্তু বিএনপির ২০০৬ সালের ভুলের মতো আওয়ামী লীগও নির্বাচন ব্যবস্থাকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আদালতের দোহাই দিয়ে উঠিয়ে দেয় এবং নির্বাচনী সংকট তৈরি করে। তথাপি, সামরিক বাহিনী ২০০৬ সালের মতো কিংমেকারের ভূমিকা না রাখায় আওয়ামী লীগ তাদের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তকে একতরফা ভোটে পরিণত করার সুযোগ পায় এবং ১৯৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কফিনে প্রায় শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। এই স্বেচ্ছাচারিতার পরণিতি কি তাদের তথাকথিত নিজস্ব ভোটব্যাংকে পড়েছে? আমি মনে করি ভালোভাবেই পড়েছে।

Image: The Daily Star, 26 December 2018

উপরের হিসেব মতে ২০১৪ সালে বহির্গামী সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগের ভোট ৩০ শতাংশের ঘরেই থাকতো। কিন্তু তারা গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়ায় আমি মনে করি এই ৩০ শতাংশ ভোটারের একটি বড় অংশের (আমার বিবেচনায় প্রায় ১০ শতাংশের) মোহভঙ্গ হয়েছে। যার ফলে ২০১৮ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আওয়ামী লীগের নিজস্ব ভোট ব্যাংক ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে আসার কথা। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল হলেও দলটি একটি অগ্রণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়াটা তাদের তথাকথিত নিজস্ব ভোটব্যাংকের আত্ম-মর্যাদাবোধ সম্পন্ন বহু মানুষ মেনে নেওয়ার কথা নয়। তথান্তু ২০১৪ সালের ওই “ভুল“ সংশোধন না করে তারা একের পর এক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক আরো সংকুচিত হয়ে গাণিতিক হিসেবেই ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেলেও কেউ অবাক হবে না। তবে কিছু অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়ন কার্যক্রম এবং এক দশক ধরে লক্ষ-লক্ষ কোটি টাকার রেন্ট সিকিংয়ের ফলে একটি বিপুল সুবিধাভোগী গোষ্ঠীও তারা তৈরি করতে পেরেছে। এ সংখ্যা ৫ শতাংশ ধরে নিলে এবং সংকুচিত ভোটব্যাংক ২০ শতাংশ বিবেচনা করলে বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার কথা নয়।

Source: Human Rights Watch

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন জনগণের একটি ব্যাপক অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ ভোটার এ পাতানো খেলায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ! রাজধানীর মতো স্থানে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে শতকোটি টাকার প্রচারণার পর ৭৩ ভাগ মানুষ নির্বাচনকে না বলেছে এর মর্মার্থও অনেক গভীরে। যে ২৭ ভাগ ভোট পড়েছে বলে দাবী করা হচ্ছে সেখানেও জোরজবরদস্তি ছিলো এবং এত অনিয়মের পরও দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা মোট ভোটের ১৫ শতাংশ বা কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, আমার ধারণা আওয়ামী লীগ ভোট ২০ শতাংশের কাছাকাছি থাকতো, কারণ পাতানো খেলার কারণে আওয়ামী লীগের সংকুচিত ভোটব্যাংকের অনেকেই ভোট দিতে আসেনি বলে আমার ধারণা। [সিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে যুগান্তরের একটি অনলাইন জরিপ দেখছিলাম যেখানে প্রায় কয়েক হাজার অনলাইন পাঠক অংশ নেয়: জরিপে শাসক দলের প্রার্থীদ্বয় মোটামুটি ২০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছে এবং বিরোধী দলীয় প্রার্থী প্রায় ৮০ শতাংশ। এটি অনলাইন জরিপ হলেও বেশ ইঙ্গিতবহ।]

Source: Democratic Rights Cartoons

বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে সুদূর পরাহত হওয়ায় প্রকৃত সমীকরণটি বুঝতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে বর্তমান স্বৈরতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকলে এবং ক্রমাগত ভোটারদেরকে অপমান-অপদস্ত করতে থাকলে আওয়ামী লীগের ভোট আরো কমবে বৈ বাড়বে না। জনগণকে ক্ষমতাহীন করলে যেসব সম্ভবনা তৈরি হবে তা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুখকর নাও হতে পারে। বৈধ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে নানা “ভিন্ন“ পন্থার উদ্ভব হয়। সেরকম পরিস্থিতিতে যদি কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা হয়, তখন পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল ফ্যাক্টর যোগ করেও আওয়ামী লীগ ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি ভোট পাবে না বলেই আমার বিশ্লেষণ। অবশ্য তার চেয়ে বড় আসন্ন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অগণতান্ত্রিক শক্তি ট্যাগ দিয়ে কেউ দলটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করলে – সেটি হবে দলটির ৭০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঘাত ও চ্যালেঞ্জ।

পুনশ্চ: আওয়ামী লীগ অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ ঘোষণা করে সংবিধানে ধারা অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এটি কেবল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই কার্যকর হতে পারে। একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে বৈধভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ (এখন যেভাবে চলছে), সেখানে কি হতে পারে?

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান