তথ্য, জ্ঞান, ও প্রজ্ঞা: বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মিথ বনাম অন্তর্দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা

Mahi – Calligraphy by Mawra Tahreem Name of Prophet Muhammad (P.B.U.H) Canvas/art print [ May 11, 2019]

“Where is the life we have lost in living?
Where is the wisdom we have lost in knowledge?
Where is the knowledge we have lost in information?
The cycles of Heaven in twenty centuries
bring us farther from God and nearer to the Dust….”

(T.S. Eliot, The Rock)

আমেরিকান কবি টি. এস. এলিয়ট তাঁর দি রক কবিতায় তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আলাদা করে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন এই তথ্য ও জ্ঞানের যুগে – আমাদের “প্রজ্ঞা“ কোথায়? আমরা তো দোলনা-থেকে-কবর পর্যন্ত পড়ি। অনেক-অনেক বই পড়ি। উচ্চশিক্ষার স্তর পেরোই। ভারী ডিগ্রি নিই। কিন্তু এই তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিভাজনে আমাদের নিজেদের অবস্থানটা কোথায় ভেবেছি কখনো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিলে আমি তথ্যজীবী হবো কিংবা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিলে আমি প্রজ্ঞাবান হবো – বিষয়টা কি এমন? কিংবা স্ব-শিক্ষিত হলে আমি কি কোনো শ্রেণিতেই পড়বো না? ডিগ্রি অর্জনের সাথে প্রজ্ঞার আদৌ কি কোনো সম্পর্ক আছে? কিংবা পড়লে কী হয়? পড়লেই কি সব হয়?

কিছু মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর – যার ফলে তারা প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিতে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যান। অনেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। অনেকে বড়-বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও ডিগ্রি লাভ করেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পাঠ, পঠন, প্রখর স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে একজন মানুষ অনেক তথ্য লাভ করে। কিংবা এই তথ্যগুলোর মাঝে পারস্পরিক যোগসূত্র আবিষ্কারের দক্ষতা অর্জন করে অনেকেই “জ্ঞানী”-ও হয়ে উঠেন। কিন্তু প্রজ্ঞা কী? তথ্য জানলে কিংবা জ্ঞানী হলেই কি একজন মানুষ প্রজ্ঞাবান? আমি মনে করি তথ্য ও জ্ঞানের ঊর্ধ্বে উঠে প্রজ্ঞার্জনের হওয়া জন্য কেবল মানুষের নিজেদের প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। বিশেষ কিছু দরকার। সে বিশেষ কিছু কি? স্বর্গীয় উপহার? স্রষ্টার অনুকম্পা?

যে গুণগুলো এই দুই প্রকার মানুষের মধ্যে পার্থক্য করে দেয় বলে আমার উপলব্ধি, সেগুলো হলো: ”গভীর চিন্তার সক্ষমতা”, “রিজনিং বা যুক্তিবোধ”, এবং “গভীর অর্ন্তদৃষ্টি”। এই গুণগুলোর কোনোটিই কি মানুষ নিজে অর্জন করতে পারে? অনেক পড়ালেখা করে? বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে? আমি বলবো – না।

ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে এমন অনেক মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে যারা অনেক বেশি “পড়েছেন“–সমাজ, সংস্কৃতি, দেশ-জাতি সব কিছু নিয়ে; কিংবা বিশ্বের সেরা সব প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিও নিয়েছেন। অনেকেরই স্মৃতিশক্তি এতটা প্রখর যে অবাক করার মতো। এঁদের ঐতিহাসিক ঘটনা, উদ্ধৃতি, সাল প্রভৃতি বিস্ময়করভাবে স্মরণ থাকে। কিন্তু তথ্য ও জ্ঞানের ভাণ্ডার হওয়াটা কি সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীর অর্ন্তদৃষ্টিতে দেখার স্বয়ংক্রিয় পূর্বশর্ত? কিংবা পূর্বোক্তটি অর্জন করলে পরেরটি সম্ভব? আমার বিবেচনায় এ দুয়ের মাঝে কোনো যোগসূত্র নেই। একজন ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি প্রখর হতে পারে কিংবা তিনি অনেক জ্ঞানীও হতে পারেন তথাপি তার গভীর অর্ন্তদৃষ্টি নাও থাকতে পারে।

তবে সহজাত গভীর অর্ন্তদৃষ্টিও অপচয় হতে পারে যদি মানুষ তার চিন্তার ডালপালাকে ছড়িয়ে না দেন। সেটি করার মূখ্য উপায় হলো “পড়া“। পড়াশোনা করলে কোনো মানুষ ডিগ্রি অর্জন করতে পারে, আবার নাও পারে। সেটি মূখ্য নয়। কিন্তু গভীর অর্ন্তদৃষ্টি সমৃদ্ধ মানুষ যদি বই পড়ে, ডান-বাম-ধর্ম-অধর্ম-ক্যাপিটালিজম-সোশ্যালিজম প্রভৃতি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করে, তথ্য ও জ্ঞানের যোগসূত্র খুঁজে বেড়ায়, এবং সমাজ-পৃথিবীটাকে জানার-বোঝার-ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, তাতে তাদের অর্ন্তদৃষ্টি শানিত হয়, সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্ব মানবতা উপকৃত হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে এই যে ”গভীর চিন্তার সক্ষমতা”, কিংবা “গভীর অর্ন্তদৃষ্টি” – এর উৎস কী? এটি কোথা থেকে আসে? কিংবা এটি পাওয়ারইবা উপায় কী? আমি দাবি করি এটি সহজাত। স্রষ্টা প্রদত্ত, স্বর্গীয় উপহার। কারণ মানুষ তার পরিশ্রম দিয়ে এটি অর্জন করতে পারে না, কেবল শানিত করতে পারে। স্রষ্টা যাদেরকে এসব আশীর্বাদ দিয়েছেন তাদের দায়িত্ব সমাজটাকে আরেকটু ভালো রেখে যাওয়া। সমাজের সম্মিলিত ভালো অর্জনে ওই গুণগুলোর সদ্ব্যবহার করা। আর এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া যে – এই গুণগুলো আমার অর্জন না, এইগুলো আমি পেয়েছি। যদি আমি না বুঝি যে কোথা থেকে পেয়েছি তাহলে বলা যে: ”এগুলো আমি পেয়েছি কিন্তু কোথা থেকে পেয়েছি জানি না।”

অনেকে বুঝবেন যে তারা গিফ্টেড, আলাদা এবং এই বৈচিত্র্য তারা “অর্জন” করেন নি। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করেন। নিজের অর্জন বলে অহংবোধ করেন। বস্তুত তারা নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছেন। সকল বিশেষ প্রাধিকারের মতোই, এই বিশেষ ক্ষমতাও কিছু মানুষের আছে, কিছু মানুষের নেই। কেন কারো আছে কিন্তু অন্যদের নেই – সে প্রশ্ন উন্মুক্ত। উত্তরও অজানা। তবে আমরা তর্ক করতে পারি এর উপযোগিতা, ব্যবহার কিংবা উদ্দিষ্ট ব্যবহার নিয়ে। আমি বিশ্বাস করি সম্ভবত কিছু মানুষ স্রষ্টার আশীর্বাদপুষ্ট এই বিবেচনায় যে এগুলোর সদ্ব্যবহার হবে ব্যক্তিগত অর্জনে বা গোষ্ঠী স্বার্থে নয়, বরং সামষ্টিক কল্যাণে, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে বৃহত্তর মানবতার কল্যাণে।

যারা বিশ্বাসী, স্রষ্টার কৃপা স্বীকার করেন, তারা কি অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন? ধর্ম মোটা দাগে একটি জীবন দর্শন। এর ব্যাপকতা অত্যন্ত গভীর। তবে অর্ন্তদৃষ্টির আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার সাথে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী হওয়ার সম্পর্ক ক্ষীণ। বহু, সম্ভবত বেশিরভাগ বিশ্বাসী লোকের মাঝেও অন্তর্দৃষ্টির ঘাটতি প্রকট। তারা হয়তো চিন্তার প্রথম স্তর থেকে ধর্মকে দেখেন। অনেকে চিন্তা ছাড়াই অন্ধভাবেই ধর্ম অনুকরণ করেন। ধর্মের মতো গভীর দর্শনের একটি বিষয়, অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় নিয়ে যদি তথ্য ও জ্ঞান-সমৃদ্ধ, কিন্তু প্রজ্ঞাহীন, লোকজন বেশি নাড়া-চাড়া করেন, তাতে ধর্মের ক্ষতি ও মানবতার সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে তার স্বরূপ দৃশ্যমান। এছাড়া অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন কিছু বিশ্বাসী মানুষ রয়েছেন যারা তাদের পড়াশোনাকে একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমিত, সংকীর্ণ করে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে নিজেদের সম্ভাবনাকেও তারা সীমিত করে ফেলেন। যার জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এই দুই চরমপন্থা থেকে ধর্ম ও মানবতার লড়াইকে জারি রাখা।

Wisdom

আমরা আশা করতে পারি যে সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে গভীর অর্ন্তদৃষ্টি না দিন কিন্তু “অন্তর্দৃষ্টি”-কে বুঝার জন্য জ্ঞান দিন। এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্য-জ্ঞান-প্রজ্ঞার তফাৎটা হৃদয়ঙ্গমের জন্য। কিংবা ধর্মীয় বিবেচনায় স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার নিদর্শন স্বরূপ। যারা ধর্ম, স্রষ্টা এসবের অস্তিত্ব নিয়ে ঘৃণা ছড়ান, নেতিবাচক কথা-বার্তা বলেন তাদের অনেককেই প্রচুর তথ্য-জ্ঞান সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব। রিচার্ড ডওকিন্স বা স্যাম হ্যারিসদের পড়াশোনা স্তর কিংবা যুক্তি-তর্কের মান বেশ সুউচ্চ। তাদের চিন্তার রিজনিং কি একটি পর্যায়ে সীমিত? তারা কি বড় চিত্রটি দেখতে পান? তাদের কি গভীর অর্ন্তদৃষ্টির সীমাবদ্ধতা রয়েছে? আমি মনে করি কারো চিন্তার বিভ্রান্তি কিংবা চিন্তার যেকোনো অসম্পূর্ণতার জন্য দায়ী অর্ন্তদৃষ্টির ঘাটতি।

সুতরাং যারা জ্ঞানী কিন্তু অর্ন্তদৃষ্টি সীমিত তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। কারণ এটি কারো ব্যক্তিগত পছন্দ নয়। এ সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি প্রদত্ত, স্রষ্টার পছন্দ। আমাদের প্রত্যেককে সেজন্য নিজেদের অবস্থানকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করে যেতে হবে: আমি আমাকে জানি তো?! কিংবা আমি কী অর্জন করেছি? কী কেবল ‘আমিই’ অর্জন করেছি?? কতটুকু আমার প্রচেষ্টার ফসল? কিংবা কতটুকু আশীর্বাদ… নিজেদের জীবনবোধ, পর্যবেক্ষণ থেকে প্রশ্ন করতে হবে একই প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা আমার মতো দেখতে-শুনতে আরেকজন বন্ধু আমার চেয়েও অনেক বেশি চেষ্টার পরও কেন একটু কিংবা অনেকখানি পিছিয়ে?

যারা জানেন না বা জানার চেষ্টা করেন না, তাদের পক্ষে চিন্তার রিজনিং-এ একটা স্তরের ঊর্ধ্বে উঠা আর সম্ভব নয়। তাই বলে তাদেরকে বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে হবে? অবশ্যই না। তাদের জন্য বরং ভালোবাসা ও অনুকম্পার দুয়ার খুলে দিতে হবে কারণ তারা “উপহার“টি পাননি কিংবা আশীর্বাদপুষ্ট নন। সর্বোচ্চ সহনশীলতার সাথে তাদেরকে ক্রমাগত যুক্তির লড়াইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তাদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করতে হবে এই জন্য যে তারা জানেন না যে তারা জানেন না।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান